Thursday, 28 April 2016

হরিদ্বারের ডায়েরী -৪

এমনিতেই আমার স্মৃতির ওপর আমার নিজেরই ভরসা নেই কোনকালেই। তাই সকালে যখন বাবা বলল, “মুসৌরী তো যাওয়াই হয়। একটা নতুন জায়গায় চল এবার, দেবপ্রয়াগ”, আমি আর আপত্তি করি নি। শুধু জানতে চেয়েছিলাম, “ওটাও কি পাহাড়?”
“অবশ্যই। নীচে দুই নদীর সঙ্গম, যেমন হয়।”
মনের খুঁতখুঁত ভাবটা যায় নি। ধর্মের কড়া গন্ধ আসছে জায়গাটা থেকে। আর যেকোন জায়গা শুধু পুণ্যস্থল বলে পরিচিত বলে তা ঘুরতে যাওয়ায় আমার বেশ আপত্তি।
এখানে একটা স্ববিরোধ কাজ করছে হয়ত। হরিদ্বারও তাই। তবে হরিদ্বারে আসা আমার পুণ্য কিনতে নয়, সেটা প্রথমেই বোধহয় পরিষ্কার করেছি। হরিদ্বারের কাছে আমার আসা স্মৃতির ডাকে, রোমন্থনলিপ্সায়, আর জায়গাগুলোর একটা revision করার প্রচন্ড ইচ্ছের তাড়নায়।
সকাল ৮টায় বেড়িয়ে পেরিয়ে এলাম পরিচিত রামঝোলা, লক্ষণঝোলা। তারপর পথে পথে আমি খুজছিলাম চমককে, যেমন সব সময়ই খুঁজে থাকি। আর তখনই হঠাৎ ড্রাইভারের একটা কথায় চমক ভাঙল আমার। “চারধাম যাওয়ার পথে দেবপ্রয়াগ দেখেছেন নিশ্চই, দাদা।
আরে! তাই তো। নামটা এবার একটু বেশি চেনাচেনা লাগছে মনে হচ্ছে। কিন্তু তাও মনে করতে পারছি না তো। মোহভঙ্গ হল আরেকটু পরে। লক্ষণঝোলা কখন পেরিয়ে এসেছি। পাহাড়ী পথ ঠিকই, কিন্তু এত রুক্ষ? গরম লাগছে তো এবার। আর পথে পথে পাথর ছড়ানো। ধুলো এসে মিশে যাচ্ছে অযত্ন চুলে। জায়গার কাছাকাছি পৌঁছে ‘তিনধারা’ নামটা দেখেই মনে পড়ল, ঠিক। এখানে আগে এসেছিলাম তো। তিনটে ধারার মিলনের একটা রেফারেন্স আছে জায়গাটায়, সেটা আগেরবার শুনেছিলাম। এবার মনে পড়ছে না। ভুল যে করছি না, সেটা বুঝতে পারলাম যখন দেখলাম পাহাড় ফুঁড়ে বিশাল মহাদেব সটান দাঁড়িয়ে আছেন। হ্যাঁ। আগেরবার এখানেই ব্রেকফাস্ট হয়েছিল।
দেবপ্রয়াগ যাওয়া এই যাত্রার একমাত্র ভুল বা না বলার মত একটা ছোট অধ্যায়। ভাগীরথী আর অলকানন্দার সংগমস্থলে আমি কোন আশ্চর্যের দেখা পাই নি।
তোমাকে বলেছি আগেও শতদ্রু, গতি কী মারাত্মক। তুমি তো আমার চেয়ে আরও অনেক দূর অবধি দেখতে পাও। তুমি দেখলে আরও ভালো বোঝাতে পারতে হয়তো, গঙ্গার এই উৎসারণ ইতিহাসে অবদান রাখা নদীদের গায়ে গঙ্গার গন্ধ একেবারেই নেই। এরা নদী। এরা আমি, আমার মতো আরও অনেকে। আর গঙ্গা হচ্ছে একটা আস্ত তুমি, একজন শতদ্রু। এমনকি তুমি গঙ্গার শাখা নদীদের কাছে যাও। তারা নদী, শুধুই প্রবাহ মাত্র। প্রবাহের জল থাকে, গতি থাকে, প্রাকৃতিক নিয়মে বয়ে যাওয়ার একটা বাধ্যবাধকতা থাকে। এই ধর আমাকে সকালে উঠতে হয়। আমার অফিসের প্রয়োজন অনুযায়ী physiological clock কে দম দিতে হয়। আমি খাই, স্নান করি। আমি কথা বলতে ভালোবাসি, পারি না যদিও। আমাকে বাজার যেতে হয়, মাসের শেষে একটা ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে হয়। এসব আরও কতবার বলেছি তোমাকে। সবই সামাজিক বা প্রাকৃতিক নিয়মে। আমি কোন শতদ্রু হতে পারব না। আমার বুকে গঙ্গা নেই, অলকানন্দা আছে। সেরকমই এরা। এরা প্রবাহিত হয়, স্বতন্ত্র হতে পারবে না কোনদিন। আর গঙ্গা?
গঙ্গা মানে তো অনেককিছু। অনেকটা জুড়ে থাকা, জড়িয়ে থাকার অন্তহীন আশ্বাস। না হলে বল, এত খরচ, এত আয়োজন, এত পরিশ্রম ‘নষ্ট’ করে শুধু শুধু লোকেরা এত এত এত প্রজন্ম পেরিয়ে কীসের জন্যে জমায়েত হয় হর কী পোড়ী বা দশাশ্বমেধ ঘাটে? কারণ আছে। নদীমাতৃক দেশ শব্দটা আমরা একসাথে স্কুলে পড়েছিলাম না? তখন ক্লাস ফোর। তুমি আমার বুকে একটা খোঁচা মেরে জিগ্যেস করেছিলা, “এই, এটার মানে কী রে?” আমি দিদিভাইকে জিগ্যেস করায় উনি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু আমরা কেউই বুঝি নি। ওই বয়সে নদী আর মা – এই দুটো কীভাবে জড়িয়ে যেতে পারে একসাথে...আমাদের বোঝার ক্ষমতা ছিল না, শতদ্রু। আমরা মা কে চিনতাম, কিন্তু মা যে কেন মা-ই সেটা তো এত বছর পেড়িয়েও বুঝতে অসুবিধে থেকেই গেল। আর নদী কীভাবে মা হতে পারবে বল তো ওই বয়সে?
হরিদ্বার শুধু নয়, গঙ্গার ধারে এলেই শুনতে পাই মা-ডাক, ছেলের জন্যে বসে থাকা এক নিরুপায় বোবা মায়ের ফুঁসে ওঠা শ্বাস। আমি নয়। আমি নিশ্চিত যে এঁরাও শুনতে পান। তাই তো গঙ্গা বলেন না এঁরা, বলেন “গঙ্গা মাঈ” কিংবা “গঙ্গা জী”। অলকানন্দার তীরে দাঁড়িয়ে আমার ড্রাইভার তো এই কথাই স্বীকার করলেন। বললেন, হরিদ্বারে গঙ্গা দেখার পর কেউ কেন দেবপ্রয়াগ আসবে? এখানে মা কোথায়?
মা নেই এখানে শতদ্রু। তাই সন্ধ্যে নেমে গেলেই হরিদ্বার ফিরে মায়ের কাছে যাব। চোখ বন্ধ করে যদি কিছু মায়ের গলা শোনা যায় দৈবাৎ। আজ ফিরছি। কাল আবার কথা হবে।
ভালো থেকো।
( ডায়েরী এখানেই শেষ। পরবর্তী পর্ব “হরিদ্বারের চিঠি” যার এখান থেকেই শুরু)

No comments:

Post a Comment