Thursday, 28 April 2016

হরিদ্বারের ডায়েরী - ৩

কাল রামঝোলা থেকে গীতাভবন হয়ে ফেরার পথে আবিষ্কার করলাম ছোটবেলার সেই রেস্তোরাঁকে, যার সামনে দাঁড়িয়ে লাফিং বুদ্ধ দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম। তবে সাথে সাথে একটা ভুল ঠিক করার অবকাশ পাওয়া গেল। লাফিং বুদ্ধ নন, ইনি ছোটিওয়ালা। হরিদ্বার সংলগ্ন অনেক এলাকাতেই ইনি মেলে দিয়েছেন শাখা। হর কী পোড়ী শাখাতে তো ইনি নেহাৎ মূর্তি নন, বসে আছেন এঁর মানসপ্রতিমার জলজ্যান্ত রূপ। এঁর ইতিহাস সত্যই আমার জানা নেই।
পরশু ট্রেনে করে আসার সময়, আরেকবার আশ্চর্যের দেখা পেয়েছিলাম, বলা হয়নি আগে। বছর ৫-৬ এর একটি মেয়ে দিল্লী থেকে হরিদ্বার, প্রায় সাড়ে চার ঘন্টার রাস্তা, দিব্যি একটা বই নিয়ে কাটিয়ে দিল। আমার পাশেও ছিল বই। আমি কিন্তু পারি নি। কিছুটা ঘুমেল চোখে, কিছুটা জানলার বাইরে ক্ষেত, অযত্নে তৈরি বাড়ি আর উত্তরপ্রদেশের গ্রাম-শহর নির্বিশেষে অপরিষ্কার অঞ্চল দেখে স্রেফ কাটিয়ে দিলাম। জানতে পারলাম, মেয়েটির বাড়ি হরিদ্বারের বিবেক বিহার অঞ্চলে। সে mount litera zee school হরিদ্বারের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। ঝরঝরে ইংরেজী, মাতৃভাষার প্রভাব মুক্ত সে বর্ণনা। তার প্রপিতামহ যখন তাকে জিজ্ঞেস করল যে বড় হয়ে সে কী হতে চায়, তার উত্তরে সে যা বলল সেটা শুনে আমি অবাকমুগ্ধ। সে এমন এক ব্যবস্থা আবিষ্কার করতে চায় যা মানুষ এবং পশুপাখিদের সহাবস্থান নিশ্চিত করবে। ব্যবস্থা আবিষ্কার...রোমহর্ষক! এক অসম্ভব ভালো দর্শন সে খুঁজে পেয়েছে এই বয়সেই। একি তাকে কেউ সত্যিই শিখিয়ে দিয়েছে বলার জন্যে? জানি না। বড় হয়েও সে এরকম ভাবতে পারবে? আরেক অঙ্কনা হয়ে যাবে না তো? সত্যিই জানা নেই আমার। তবে থাক তুই এরকমই। এই প্রথমবার আমি একজনের দেখা পেলাম যে আমার ছোটবেলার দর্শনের গণ্ডীকেও অনেকাংশে ছাপিয়ে গিয়েছে।
অবাক করলেন হৃষীকেশ থেকে হরিদ্বারের পথে অটোচালক একইভাবে। রাস্তার একধারে ডাঁই করা আছে সমস্ত জঞ্জাল। এত খাবার। গরু, অন্য অনেক পশু, পাখী আর কিছু কুকুর তার কাছে ঘুরছে কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে তারা মন থেকে এ খাবার খিদে থাকলেও খেতে চায়না। আমার অটোচালক স্থানীয় হিন্দীতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার বললেন- “দেখছেন স্যর? বিয়েবাড়ির বেঁচে যাওয়া খাওয়ার। এমন খাওয়ার আজকাল বানায় এরা...মশলার ঝাঁঝে জানোয়ারেরাও মুখে দিচ্ছে না।“ উত্তর ভারতের অনেক জায়গাতেই খাবার এরকম মশলাদার। সেখানে এক প্রান্তিক মানুষের এরকম প্রতিস্পর্ধী উচ্চারণ? তারপর বললেন, “বিকাশ কোথায় হচ্ছে স্যর? এখন জানোয়ারেরাও আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বিকশিত। বিকাশতো মানুষেরই খুব দরকার”
তাজ্জব বনে গেছি। Shaw সাহেবের Superman concept এর একটা সম্পূর্ণ antithesis ভদ্রলোক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। উন্নয়ন? ভাবনার বিকাশ? ছ্যা ছ্যা। হাস্যকর। “হাস্যকর তোমার অতীত, হাস্যকর তোমার ভবিষ্যৎ”। তুমি পেছনের দিকে এগিয়ে চলেছ!
( ক্রমশ : )

No comments:

Post a Comment