“আমার দিনের ওপর তুমি সবুজ হয়ে থাক , রাত থেকে অনুপম রাতে
তারাদের ঝিলমিলে অগণিত আলোকণা মাখ, বিকশিত কোন জ্যোৎস্নাতে।
কথা বল, শোন কথা গোপনীয়
চুম্বন চাও,
ফেলে রাখি রক্তিম ভালোবাসা
চুম্বন নাও।
অতলের বুকে চলে অগণিত মানুষের মেলা-সমাহার
ব্যবসা ও ধর্মের অপরূপে ডানা মেলে, হরের দুয়ার।”
এটা সম্ভবত লিখেছিলাম ২০০৯-এ। সেবার প্রায় ১২-১৩ বছর পর হরিদ্বারে আসা, অনেকটা সতেজ স্মৃতি-মেদুরতা নিয়ে। কিছুটা খারাপ লাগার স্মৃতি, কিছুটা বর্ণময়। তবে আরেকটা ব্যপারও ছিল – অঙ্কনা। তার কথায় পরে আসছি।
সেবার হরিদ্বার আসতে আসতে একটা অতীতকে টেনে টেনে, ঘসতে ঘসতে আনছিলাম। একটা বাজার। সরু গলি। আলো ঝলমলে সোনালি দোকান। ঠাসাঠাসি করে এগিয়ে চলেছে লোকজন। আর দুটো বছর পাঁচেকের ছেলে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন ওই আলোর দোকান থেকে তার বাবার হাত টেনে, জামা টেনে আবদার করছে খেলনা নাগরদোলা কিনে দিতে, ভালুক কিনে দিতে, আরও কত কী। সেসব আজ আর মনেও পড়ে না। এই ছেলেটির বাবা-মা করে তুলছেন তাদের সাধ্যের মধ্যে ছেলেটির ইচ্ছাপূরণ।
আরেকটা ছেলে হাঁটছে ঘুমের মধ্যে। ঘুমের সময় হয়ে গেছে তার অনেকক্ষণ। তাই মাটির সাথে ঘষে ঘষে সে এগোচ্ছে। তবে তার আরেকটা কারণও আছে। আলো থেকে পালাতে চাইছে সে। আলোর দোকানমহল ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠেছে তার কাছে। কী হবে আলো দেখে? এর একটাও তো সে পাবে না। আর্থিক সঙ্গতি থাকা সত্যেও বাবা-মায়ের অনুমতি নেই।
তবু ওর মধ্যেই ছেলেটির মথুরার প্যাঁড়া ভালো লেগেছিল, এক নামভোলা রেস্তোরাঁর সামনে লাফিং বুদ্ধ দেখে অবাক হয়েছিল সেই ছেলে, বাঁদরের উৎপাত সত্বেও তার এখনও ইচ্ছে হয় ছেলেবেলার বৃন্দাবন দেখার, এখনও তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল আগ্রার তাজমহল আর তার মার্বেল পোড়া রোদ। তবে সবচেয়ে কাছের হয়ে আছে আজও হরিদ্বার –সন্ধ্যের হর কি পোড়ীর ঘাট, স্রোতস্বিনী গঙ্গার ফেনিল দুধ, জলে ভাসা সারিসারি আগুনফুলের মালা, লজের দরজা খুললেই ঢুকে পড়া গঙ্গা, ঘি-ভাত-পাঁপড়ের অবাঙ্গালী নিরামিষ সনাতনী স্বাদ ... সমস্ত কিছু। এর সবটা সে পেতে চাইছে ফিরে ফিরে।
আরেকটু বড় হয়ে ক্লাস ৭ –এ আশ্চর্য ভাবে তার আলাপ একটি মেয়ের সাথে। কলকাতা থেকে গান শিখে সরাইঘাট এক্সপ্রেসের সাইড লোয়ার বার্থে পা এলিয়ে সে বসে ছিল এক বিকেলবেলা। অতর্কিতে একটি মেসেজ ঢুকে পড়ল ইনবক্সে (সিম সার্ভিসে ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবের সদস্য হওয়ার ফল)অঙ্কনা নামের একটি মেয়ের। মেয়েটি তার বোন হয়ে ছিল বাকি দিনগুলো নাকি গার্লফ্রেন্ড, সেটা সে তখন বোঝে নি। আজ অনেকটাই বোঝে। অঙ্কনা থাকত হরিদ্বারে ; বাংলায় ছিল অবাঙ্গালী টান। তবু হিন্দী বিদ্বেষী সেই কিশোরের ওই বয়সে এক কিশোরীর জন্যে যে অনুভূতি হওয়া উচিত, তা অঙ্কনাই তাকে এনে দিয়েছিল। কত দুপুর, কত সন্ধ্যে, কত একান্ত ফোন-মেসেজ-মিস্ড কলের অপেক্ষা।
অঙ্কনা , বোন, ভালোলাগার শ্বাস ! এতবার হরিদ্বার এল সে, তোর সাথে দেখা হলনা। যোগাযোগ নেই আর। আজও কি হরিদ্বারে থাকিস তুই? কাকিমার ফার্স্ট স্টেজ ক্যান্সার ধরা পড়েছিল না? বলেছিলি ভালো হয়ে যাবেন? ভালো আছেন? আছেন কি তিনি? আর তুই?
সবকিছু নিয়ে তাই সে আজ এসেছে হু-হু করা বুকের আঁচলে। চোখে পড়ে গেছে তার ট্রেনের বাইরে ক্ষেতের ওপর একাকী অপূর্ব ময়ূর।
এখন সাড়ে ছটা। আর একটা ঘন্টা। রূড়কী এল বলে। হরিদ্বার বেশি দূর নয়।
এসেই পড়েছে।
( ক্রমশঃ)
No comments:
Post a Comment