Sunday, 1 May 2016

হরিদ্বারের চিঠি - ১

কী রকম বিকেল জেনেছ তুমি? এখানে বিকেল চিরস্থায়ী। এখানে সন্ধ্যে কীভাবে আসে, তা বুঝতে গেলে তোমায় অনেকটা সময় ঘাটে বসে থাকতে হবে, শতদ্রু। কাজটা তোমার জন্যে সহজ নয় জানি। তোমার শরীর থেকে গত বছরেই বেড়িয়ে গিয়েছিল অনেকটা জীবন। হাসপাতালেও তো কতগুলো দিন একা একা কাটিয়ে ছিলে।
আজ তোমায় মনসা পাহাড়ের গল্প বলি শোন। এক একটা পাহাড় কী ভীষণ রকম একা, ভেবেছ? আর কিছু কিছু পাহাড় ভাগ্যবান। একটা গোটা শহরকে নিয়ে বেঁচে আছে সে। তুমি ভাব শতদ্রু, যদি তোমার পাড়ার পাশেই থাকত একটা আস্ত পাহাড়, ওর কাছে কতবার ফিরে ফিরে যেতে তুমি? ধরে নাও, কলকাতা এত বড় একটা শহর নয়, কয়েকটা ছোট পাড়া মাত্র। ধরে নাও, এর গণ্ডী গড়িয়া থেকে বালিগঞ্জ, ব্যস! তার বেশি নয়। আর এর মধ্যেই যদি ওই ধর ঢাকুরিয়ার কাছে একটা পাহাড় মাথা তুলে আমাদের দেখছে। আমি বা তুমি বা আমরা সবাই কয়েকটা জীবনযাপনের পর, খুব কি যেতাম ওর কাছে? মনে তো হয় না। এদিক থেকে মনসা পাহাড় ভাগ্যবান। হর কী পোড়ী যেতে যে বাজার, তার একটা গলি দিয়ে বেরোলেই মনসা পাহাড়ে পায়ে হেঁটে ওঠার পথ। অনেক সিঁড়ি। তোমাকে বলা হয় নি জানো, সেই ছোটবেলা বাবা আর আমি মিলে উঠেছিলাম একবার পুরোটা পথ পায়ে হেঁটে। একটু একটু করে উঠে যাচ্ছি, আর নীচের শহরের ছোট হয়ে যাওয়াটা দেখে নিচ্ছি প্রত্যেক পদক্ষেপে। আমার মতই এক পাহাড়যাত্রী আমাকে সাবধান করে দিলেন নরম ভাবে – এত পেছনে দেখো না। পা হড়কে যাবে। আমি কী করে বলি শতদ্রু, ওই মুহূর্তে আমি তো পাহাড়ে উঠছিলাম না, আমি আস্তে আস্তে শূন্যে ওঠার যে কী শিহরণ, সবটা শুষে খাচ্ছিলাম সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে। আমার পা বাধ সেধেছিল কিন্তু জানো। কিন্তু তখন সেই হরিদ্বারের বিকেল। মনসা পাহাড়ের চূড়া বেয়ে বিকেল গড়িয়ে পড়ছে আমার গায়ে, মাথায়, বুকে। কিছু সবান্ধব বাঁদরেরা উপভোগ করছে দিনের শেষ আলোয় গাছের পাতার রঙ। কেউ কেউ ওদের মধ্যেই দৈবাৎ পড়ে যাচ্ছে খাবারের লোভে, ছিনিয়ে নিচ্ছে হাত থেকে মনসাদেবীর পুজোর প্রসাদ। ভুল করে মুক্তোর মালা নয়, ওদের হাতে গেঁথে গিয়েছে ফুলমালা। না শতদ্রু। বাঁদর নিয়ে কোন রোম্যান্টিকতা আমার আসে না ঠিকই, কিন্তু বাঁদরেরও কি ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে না কোনদিন?
এভাবেই উঠে গিয়ে তুমি মন্দির না দেখেও নেমে আসতে পার। তাতে অপরাধ নেই। নীচে একটা স্ববিরোধে মোড়া শহর গা এলিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তুমি দেখতেই পারো। স্ববিরোধ কেন? গঙ্গা সন্তান, ধর্মের আখড়ায় ব্যস্ততা কীসের বাপু?
মনসা পাহাড় একা নয়। তুমি যখনই যাবে, দেখবে কত লোক রজ্জুপথ বেয়ে ওঠার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। একা মানুষ একা নয়। চুপ মানুষ একা নয়। হয়তো মনসা পাহাড় নিজেও জানে না, কত মানুষ ওর বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পরম শ্রদ্ধায়। আমিও ‘নতজানু হয়ে ছিলাম তখন, এখনও যেমন আছি’। ওকে আমি এ কথা কীভাবে বলি বলো? আমাকেও কেউ বলেছে কি? আমি শুনেছি? তুমি শুনতে পেয়েছ আমি এতবার বলে গেছি তোমাকে?
তাহলে এস। একবার দাঁড়াই। মুখোমুখি। পাহাড়ের তলায়। আর একবার দাঁড়াই মুখ ফিরিয়ে। পাহাড়ের শীর্ষে। বলি, প্রণাম!

Thursday, 28 April 2016

হরিদ্বারের ডায়েরী -৪

এমনিতেই আমার স্মৃতির ওপর আমার নিজেরই ভরসা নেই কোনকালেই। তাই সকালে যখন বাবা বলল, “মুসৌরী তো যাওয়াই হয়। একটা নতুন জায়গায় চল এবার, দেবপ্রয়াগ”, আমি আর আপত্তি করি নি। শুধু জানতে চেয়েছিলাম, “ওটাও কি পাহাড়?”
“অবশ্যই। নীচে দুই নদীর সঙ্গম, যেমন হয়।”
মনের খুঁতখুঁত ভাবটা যায় নি। ধর্মের কড়া গন্ধ আসছে জায়গাটা থেকে। আর যেকোন জায়গা শুধু পুণ্যস্থল বলে পরিচিত বলে তা ঘুরতে যাওয়ায় আমার বেশ আপত্তি।
এখানে একটা স্ববিরোধ কাজ করছে হয়ত। হরিদ্বারও তাই। তবে হরিদ্বারে আসা আমার পুণ্য কিনতে নয়, সেটা প্রথমেই বোধহয় পরিষ্কার করেছি। হরিদ্বারের কাছে আমার আসা স্মৃতির ডাকে, রোমন্থনলিপ্সায়, আর জায়গাগুলোর একটা revision করার প্রচন্ড ইচ্ছের তাড়নায়।
সকাল ৮টায় বেড়িয়ে পেরিয়ে এলাম পরিচিত রামঝোলা, লক্ষণঝোলা। তারপর পথে পথে আমি খুজছিলাম চমককে, যেমন সব সময়ই খুঁজে থাকি। আর তখনই হঠাৎ ড্রাইভারের একটা কথায় চমক ভাঙল আমার। “চারধাম যাওয়ার পথে দেবপ্রয়াগ দেখেছেন নিশ্চই, দাদা।
আরে! তাই তো। নামটা এবার একটু বেশি চেনাচেনা লাগছে মনে হচ্ছে। কিন্তু তাও মনে করতে পারছি না তো। মোহভঙ্গ হল আরেকটু পরে। লক্ষণঝোলা কখন পেরিয়ে এসেছি। পাহাড়ী পথ ঠিকই, কিন্তু এত রুক্ষ? গরম লাগছে তো এবার। আর পথে পথে পাথর ছড়ানো। ধুলো এসে মিশে যাচ্ছে অযত্ন চুলে। জায়গার কাছাকাছি পৌঁছে ‘তিনধারা’ নামটা দেখেই মনে পড়ল, ঠিক। এখানে আগে এসেছিলাম তো। তিনটে ধারার মিলনের একটা রেফারেন্স আছে জায়গাটায়, সেটা আগেরবার শুনেছিলাম। এবার মনে পড়ছে না। ভুল যে করছি না, সেটা বুঝতে পারলাম যখন দেখলাম পাহাড় ফুঁড়ে বিশাল মহাদেব সটান দাঁড়িয়ে আছেন। হ্যাঁ। আগেরবার এখানেই ব্রেকফাস্ট হয়েছিল।
দেবপ্রয়াগ যাওয়া এই যাত্রার একমাত্র ভুল বা না বলার মত একটা ছোট অধ্যায়। ভাগীরথী আর অলকানন্দার সংগমস্থলে আমি কোন আশ্চর্যের দেখা পাই নি।
তোমাকে বলেছি আগেও শতদ্রু, গতি কী মারাত্মক। তুমি তো আমার চেয়ে আরও অনেক দূর অবধি দেখতে পাও। তুমি দেখলে আরও ভালো বোঝাতে পারতে হয়তো, গঙ্গার এই উৎসারণ ইতিহাসে অবদান রাখা নদীদের গায়ে গঙ্গার গন্ধ একেবারেই নেই। এরা নদী। এরা আমি, আমার মতো আরও অনেকে। আর গঙ্গা হচ্ছে একটা আস্ত তুমি, একজন শতদ্রু। এমনকি তুমি গঙ্গার শাখা নদীদের কাছে যাও। তারা নদী, শুধুই প্রবাহ মাত্র। প্রবাহের জল থাকে, গতি থাকে, প্রাকৃতিক নিয়মে বয়ে যাওয়ার একটা বাধ্যবাধকতা থাকে। এই ধর আমাকে সকালে উঠতে হয়। আমার অফিসের প্রয়োজন অনুযায়ী physiological clock কে দম দিতে হয়। আমি খাই, স্নান করি। আমি কথা বলতে ভালোবাসি, পারি না যদিও। আমাকে বাজার যেতে হয়, মাসের শেষে একটা ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে হয়। এসব আরও কতবার বলেছি তোমাকে। সবই সামাজিক বা প্রাকৃতিক নিয়মে। আমি কোন শতদ্রু হতে পারব না। আমার বুকে গঙ্গা নেই, অলকানন্দা আছে। সেরকমই এরা। এরা প্রবাহিত হয়, স্বতন্ত্র হতে পারবে না কোনদিন। আর গঙ্গা?
গঙ্গা মানে তো অনেককিছু। অনেকটা জুড়ে থাকা, জড়িয়ে থাকার অন্তহীন আশ্বাস। না হলে বল, এত খরচ, এত আয়োজন, এত পরিশ্রম ‘নষ্ট’ করে শুধু শুধু লোকেরা এত এত এত প্রজন্ম পেরিয়ে কীসের জন্যে জমায়েত হয় হর কী পোড়ী বা দশাশ্বমেধ ঘাটে? কারণ আছে। নদীমাতৃক দেশ শব্দটা আমরা একসাথে স্কুলে পড়েছিলাম না? তখন ক্লাস ফোর। তুমি আমার বুকে একটা খোঁচা মেরে জিগ্যেস করেছিলা, “এই, এটার মানে কী রে?” আমি দিদিভাইকে জিগ্যেস করায় উনি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু আমরা কেউই বুঝি নি। ওই বয়সে নদী আর মা – এই দুটো কীভাবে জড়িয়ে যেতে পারে একসাথে...আমাদের বোঝার ক্ষমতা ছিল না, শতদ্রু। আমরা মা কে চিনতাম, কিন্তু মা যে কেন মা-ই সেটা তো এত বছর পেড়িয়েও বুঝতে অসুবিধে থেকেই গেল। আর নদী কীভাবে মা হতে পারবে বল তো ওই বয়সে?
হরিদ্বার শুধু নয়, গঙ্গার ধারে এলেই শুনতে পাই মা-ডাক, ছেলের জন্যে বসে থাকা এক নিরুপায় বোবা মায়ের ফুঁসে ওঠা শ্বাস। আমি নয়। আমি নিশ্চিত যে এঁরাও শুনতে পান। তাই তো গঙ্গা বলেন না এঁরা, বলেন “গঙ্গা মাঈ” কিংবা “গঙ্গা জী”। অলকানন্দার তীরে দাঁড়িয়ে আমার ড্রাইভার তো এই কথাই স্বীকার করলেন। বললেন, হরিদ্বারে গঙ্গা দেখার পর কেউ কেন দেবপ্রয়াগ আসবে? এখানে মা কোথায়?
মা নেই এখানে শতদ্রু। তাই সন্ধ্যে নেমে গেলেই হরিদ্বার ফিরে মায়ের কাছে যাব। চোখ বন্ধ করে যদি কিছু মায়ের গলা শোনা যায় দৈবাৎ। আজ ফিরছি। কাল আবার কথা হবে।
ভালো থেকো।
( ডায়েরী এখানেই শেষ। পরবর্তী পর্ব “হরিদ্বারের চিঠি” যার এখান থেকেই শুরু)

হরিদ্বারের ডায়েরী - ৩

কাল রামঝোলা থেকে গীতাভবন হয়ে ফেরার পথে আবিষ্কার করলাম ছোটবেলার সেই রেস্তোরাঁকে, যার সামনে দাঁড়িয়ে লাফিং বুদ্ধ দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম। তবে সাথে সাথে একটা ভুল ঠিক করার অবকাশ পাওয়া গেল। লাফিং বুদ্ধ নন, ইনি ছোটিওয়ালা। হরিদ্বার সংলগ্ন অনেক এলাকাতেই ইনি মেলে দিয়েছেন শাখা। হর কী পোড়ী শাখাতে তো ইনি নেহাৎ মূর্তি নন, বসে আছেন এঁর মানসপ্রতিমার জলজ্যান্ত রূপ। এঁর ইতিহাস সত্যই আমার জানা নেই।
পরশু ট্রেনে করে আসার সময়, আরেকবার আশ্চর্যের দেখা পেয়েছিলাম, বলা হয়নি আগে। বছর ৫-৬ এর একটি মেয়ে দিল্লী থেকে হরিদ্বার, প্রায় সাড়ে চার ঘন্টার রাস্তা, দিব্যি একটা বই নিয়ে কাটিয়ে দিল। আমার পাশেও ছিল বই। আমি কিন্তু পারি নি। কিছুটা ঘুমেল চোখে, কিছুটা জানলার বাইরে ক্ষেত, অযত্নে তৈরি বাড়ি আর উত্তরপ্রদেশের গ্রাম-শহর নির্বিশেষে অপরিষ্কার অঞ্চল দেখে স্রেফ কাটিয়ে দিলাম। জানতে পারলাম, মেয়েটির বাড়ি হরিদ্বারের বিবেক বিহার অঞ্চলে। সে mount litera zee school হরিদ্বারের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। ঝরঝরে ইংরেজী, মাতৃভাষার প্রভাব মুক্ত সে বর্ণনা। তার প্রপিতামহ যখন তাকে জিজ্ঞেস করল যে বড় হয়ে সে কী হতে চায়, তার উত্তরে সে যা বলল সেটা শুনে আমি অবাকমুগ্ধ। সে এমন এক ব্যবস্থা আবিষ্কার করতে চায় যা মানুষ এবং পশুপাখিদের সহাবস্থান নিশ্চিত করবে। ব্যবস্থা আবিষ্কার...রোমহর্ষক! এক অসম্ভব ভালো দর্শন সে খুঁজে পেয়েছে এই বয়সেই। একি তাকে কেউ সত্যিই শিখিয়ে দিয়েছে বলার জন্যে? জানি না। বড় হয়েও সে এরকম ভাবতে পারবে? আরেক অঙ্কনা হয়ে যাবে না তো? সত্যিই জানা নেই আমার। তবে থাক তুই এরকমই। এই প্রথমবার আমি একজনের দেখা পেলাম যে আমার ছোটবেলার দর্শনের গণ্ডীকেও অনেকাংশে ছাপিয়ে গিয়েছে।
অবাক করলেন হৃষীকেশ থেকে হরিদ্বারের পথে অটোচালক একইভাবে। রাস্তার একধারে ডাঁই করা আছে সমস্ত জঞ্জাল। এত খাবার। গরু, অন্য অনেক পশু, পাখী আর কিছু কুকুর তার কাছে ঘুরছে কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে তারা মন থেকে এ খাবার খিদে থাকলেও খেতে চায়না। আমার অটোচালক স্থানীয় হিন্দীতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার বললেন- “দেখছেন স্যর? বিয়েবাড়ির বেঁচে যাওয়া খাওয়ার। এমন খাওয়ার আজকাল বানায় এরা...মশলার ঝাঁঝে জানোয়ারেরাও মুখে দিচ্ছে না।“ উত্তর ভারতের অনেক জায়গাতেই খাবার এরকম মশলাদার। সেখানে এক প্রান্তিক মানুষের এরকম প্রতিস্পর্ধী উচ্চারণ? তারপর বললেন, “বিকাশ কোথায় হচ্ছে স্যর? এখন জানোয়ারেরাও আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বিকশিত। বিকাশতো মানুষেরই খুব দরকার”
তাজ্জব বনে গেছি। Shaw সাহেবের Superman concept এর একটা সম্পূর্ণ antithesis ভদ্রলোক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। উন্নয়ন? ভাবনার বিকাশ? ছ্যা ছ্যা। হাস্যকর। “হাস্যকর তোমার অতীত, হাস্যকর তোমার ভবিষ্যৎ”। তুমি পেছনের দিকে এগিয়ে চলেছ!
( ক্রমশ : )

Sunday, 24 April 2016

হরিদ্বারের ডায়েরী - ২

এয়ার ইন্ডিয়া ২১ নম্বর বিমানে করে আসতে আসতে দেখছিলাম বাদশাহী আংটি। কিছুটা দেখার পরেই কাকতালীয় ভাবে বোঝা গেল যে, সিনেমাটি এই যাত্রার পক্ষে সত্যিই উপযুক্ত। সিনেমার অনেকটা অংশ জুড়ে রয়েছে হরিদ্বার এবং তার প্রতিবেশী জায়গার রেফারেন্স – হরিদ্বার, লক্ষ্মণঝোলা, রামঝোলার কথা। এছাড়া ছবিতে রয়েছে হৃষীকেশের পথে পড়ে থাকা সেই জঙ্গল যেখানে ছবির ক্লাইম্যাক্সের চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে। তবে তার চেয়েও দরকারী একটা রেফারেন্স আছে এই সিনেমাতে – গঙ্গাকে নিয়ে একটা one-liner.  একটু ভালোভাবে লক্ষ করলেই বোঝা যাবে, গঙ্গা কীভাবে এক এক জায়গায় বদলে ফেলেছে তার গতি, রঙ এবং চালচলনের নিজস্বতা ; হরিদ্বারে এক, হৃষীকেশে এক, লক্ষণঝোলায় একবারে আলাদা।
বিমান অবতরণের পর রেলস্টেশন অবধি যাত্রাও ছিল বেশ আরামদায়ক। বোধিসত্ব বলেই দিয়েছিল, ‘এয়ার ইন্ডিয়ায় যাচ্ছিস তো? ৩নং টার্মিনালে নামাবে। পাশের বিল্ডিংটাই মেট্রোর।  It is even connected. Quite convenient.’ সত্যিই তাই। খুঁজে পাওয়া সোজা, পৌঁছে যাওয়াও। দিল্লীর মেট্রো বেশ খরচার ব্যপার, তবে অনেকবেশী ঝকঝকে। সবচেয়ে মজার ব্যপার হল – প্ল্যাটফর্ম আর রেললাইনের মাঝে রয়েছে transparent দরজা। ট্রেন এসে দাঁড়ালেই দরজা খুলবে। Frustration ফেলতে যখন তখন লাইনে ঝাঁপিয়ে পড়বে কলকাতার মত... হু হু বাবা। সে পথ বন্ধ।
T3 সংলগ্ন মেট্রো স্টেশনের নামই এয়ারপোর্ট।দ্বারকা সেক্টর ২১ থেকে আসা এই মেট্রো দিল্লী aero-city, ধৌলা কুয়া, শিবাজী স্টেডিয়াম পেরিয়ে চলে এসেছে নতুন দিল্লীতে। রাস্তা পেরোলেই রেল স্টেশন। ২০ মিনিট মত লাগে।
নিরস যাত্রার বর্ণনা পেরিয়ে এবার আসল কথায় আসা যাক।  ভোর সাড়ে পাঁচটায় বেড়িয়ে দেখলাম হর কী পোড়ীর ঘাটের ওপর ধীরে ধীরে গা এলিয়ে দিচ্ছে সকালের সন্তান। তার পেলব আলোর চাদর জড়িয়ে গঙ্গায় নেমে পড়ছেন বেশ কিছু মানুষ। “গঙ্গা জী” এবং তাঁর এই জলপ্রবাহের সাথে আমাদের আত্মীয়তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পেরিয়ে। অথচ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে গঙ্গার জলদূষণের পেছনে রয়েছে এই ধর্মের আর আত্মীয়তার থাবা। যে ধর্ম বিশ্বাস করে গঙ্গার জলেই আছে, শুদ্ধকারী এক মায়াবী ক্ষমতা, সেই ধর্মই শেষ করে দেবে এই মাতৃদুগ্ধ?
আরেকটু পরেই একটা সুস্থ সকাল ছড়িয়ে গেল সমস্তট জুড়ে। চলেছি লক্ষণঝোলা। তারপর সেখান থেকে ছোটবেলার পথ, সেতুর কাঁপুনি। এখনও এদিকে Jumpin পাওয়া যায়, Frooti র বিকল্প হিসেবে। সেই কবে খেয়েছিলাম। হেঁটে হেঁটে গীতাভবন, রামঝোলা থেকে নৌকো করে গঙ্গা পেরোতে থাকি আর ভাবি – এবার হল না। পরের বার এখানে এসে থাকব আর জমিয়ে Jumpin খেতে হবে।

(ক্রমশঃ)

Saturday, 23 April 2016

পাখি

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় পথে ঘাটে দেখা হচ্ছে কত মনে রাখার মত মানুষের সাথে, কানে এসে পড়ছে তাদের কথাবার্তা। এরকম ভাবেই সেদিন আমায় রাতে অফিস পৌঁছে দিলেন কর্মরত এক ড্রাইভার।
মনে রাখার মত একজন মানুষ।
বলে গেলেন অনেক কথা। কিছুটা মনে রাখলাম, আর আমার ভঙ্গুর স্মৃতি ভুলিয়ে দিল বেশিরভাগ আলাপচারিতাকে।
"ছেলের জন্মদিন ছিল স্যর। সেদিন পকেটে ১৫০ টাকার মত। কী করলাম জানেন? ছেলেকে বুঝতে দিই নি কিন্তু। চলে গেলাম, ওই যে কামালগাজীর কাছে নতুন ব্রিজটা হয়েছে না?..." "হ্যাঁ " "ওখানে। Roadside ধাবা আছে একটা। কী taste ওখানের খাওয়ারের সেটা আপনি না খেলে, ও আপনাকে, বোঝানো যাবে না। আমি, আমার wife আর ছেলে। তিনটে মোগলাই নিলাম। ওই ১২০ টাকার মত পরল বুঝলেন। তারপর বেরিয়ে নিলাম তিনটে কোল্ড-ড্রিঙ্কস্‌। ব্যস। ওই ধরুন ১৬০ এর মধ্যে নেমে গেল, কুড়িয়ে-টুড়িয়ে, আর কী!" ... "আসলে enjoy করার মন থাকলে না স্যর, কিছু দরকার হয় না আর, কি তাই না?"
সোজা কথা এতটা সোজা ভাবে শুনে আমি বিনম্র হেসে ফেলি।
উনার কাছেই জানতে পারে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে ডিমের ডালনা বানানোর পদ্ধতি। "ঝোল তিন রকমের হয় স্যর, জানেন তো? একটা হোল মাছের ঝোল যেরকম। আর গ্রেভি একটা - ঘন একেবারে। আর এই ডালনার ব্যপারটা হচ্ছে মাঝামাঝি, গা-মাখা গা-মাখা হবে।" "কী করে বানান এটা?" "আসলে কাঠের চুল্লি হলে ভালো হয়, বুঝলেন কি না। গ্যাসে কী হয়, নিচের দিকে একটা জা'গায় তাপটা লাগে। আর কাঠে রান্নার স্বাদই আলাদা, চার দিক থেকে তাপ এসে পড়ছে। যা হোক, ওই আপনি, তেলে কটা কালোজিরে আর দুটো কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দেবেন। ফ্লেভার আসবে। তারপর পেঁয়াজ। তারপর আলু দিলেন। একটু সাঁতলে নেবেন। তারপরে টমেটো। নুন দিলেন ; অল্প হলুদ দেবেন না হলে ডিমগুলো আবার দেখতে বাজে লাগবে পরে । কাঁচা লঙ্কাও দিতে পারেন, যতটা spicy খান আপনি। ব্যস, এ-এ-একটু জল। জলটা একটু টেনে এলেই ডিমগুলো দিয়ে দেবেন। ব্যস" বানানো হয়েছিল, সত্যিই অপূর্ব।
আরো জেনে নিলাম যে Quest mall এর পাশের গলিতেই আদিলের বিরিয়ানী, উনার মতে কোলকাতায় street side বিরিয়ানীর দোকানগুলোর মধ্যে সেরা। খেলাম ; চমৎকার। এছাড়া বৈষ্ণবঘাটা বাসস্টপের পাশের গলিতে ভানু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের রসগোল্লা। আহা।
ধন্যবাদ আপনাকে - আমার রাতকে রংমহল করে তোলার জন্যে, আমার ছুটির দুটো দিন আনন্দে ভরে দেওয়ার জন্যে। পরদিন সকালে ইউনিটেকেও পাখির আওয়াজ শুনতে দিলেন আপনি।
ভালো থাকবেন।

Look Back in Reverence

Beneath the last trace of a jaundiced eye
Under the torpor
Of wilting wee hours,
I found some moribund trees.
Leaves trailing in a susurrus trance,
Like a frail man, struggling hard with his memories
To recreate the past, the ecstasy,
Quiet-forgotten jubilance.

Your eyes are trailing back,
Old faces turn anew.
None can hinder the ‘widening gyre’
That revolves a future with lofty glance
A pursuit for ‘immemorial glories’, still
‘Long-famous shames’, unsavoury pasts!

[Is it all I remember?
Is it what I craved for?
Waking up in a homely bed, caressing
The daylight in blindness
With a pristine, monastic delight?]

Winter was at its best,
So has been the summer.
A fetid monsoon gives way to
Another vernal gloom.

But hold! Still shines the light,
More grace I gathered, less is the hour of repent,
Now all these compounds,
Combusts
        Constitutes,
                     And finally,
                                     Are concentrated into a gushing waterfall on sterile pebbles…

Now here I stand,
You and I,
“When the evening is spread upon the sky”
Like an Erect tree, rejuvenated in fertile pebbles;
Ever the best with Hope,
Ever the best with Mercy,
Ever drenched in Eternal Forgiveness.

বৈঠকি

সারা সকাল জুড়ে বৈঠকি মেজাজ। হবেই তো। আজ পয়লা বৈশাখ। তাই যাদের দিনগুলো থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে একেকটা সকাল, আর অন্যদিনের মতই, তাদের মাথাতেও চাপল এমন ভূত? কার উদ্যোগে? কার উদ্যমে?
না, ব্যপারটা তাহলে গোড়া থেকেই বলি।
অ্যাক্সেঞ্চারে ঢোকার পর থেকেই আমি ছুটির দুটো দিন একটু অন্যভাবে কাটানোর চেষ্টা করি। নিজেকে সবসময় আশ্বাস দিতে থাকি যে, ছুটি কাটানোটাও একটা আর্ট, একটা জীবনশিল্পের 'ভোলা-বাহুল্য' অংশ। গতকাল বুয়া (অর্থাৎ আমার পিসি) বলছিল সকালে একটু মাংস আনার কথা। যে বাড়ির পরতে পরতে এখনও জড়িয়ে আছে শুদ্ধ বাংলা বলার চল, বাংলা গান, কবিতা, বইয়ের গল্প, কিংবা অযাচিত ভাবে ঢুকে পড়া বাংলা সুপার-ডূপার মেগা সিরিয়ালের শাসন , সে বাড়িতে বাংলা বছরের প্রথম দিনে একটু পোলাও, পায়েস, মাংস – এসব হবেনা, তা হয় না কি? তাই ভেবেছিলাম, পিসি না বললেও আনতে হবেই আজ একটু বাসন্তী পোলাও, ভেটকি পাতুরী – এসব। কলকাতায় আজকাল ভুলে যাওয়া বাঙ্গালীয়ানা ভেজা ‘জিভ-উত্তেজক’ খাবারকে কর্পোরেট মোড়কে available করেছে নানা রেস্তোরাঁ। মন্দ কি? গড়ে উঠেছে কৃত্রিম গ্রাম, লুচি- ছোলার ডালের সাথে ওয়াইনের মৌতাত ভেজা গ্রামীন দোতলা বাড়ি। কড়ি ফেললেই, গ্রাম বাংলা কিংবা সত্তরের দশকের প্রায় বিস্মৃত বাংলা খাবার, পোশাক, গান – সবটাই পরিশ্রম বাদ দিয়ে মিলে যাবে হাতের কাছেই। একবারও প্রয়োজন পড়বেনা সেই সংস্কৃতির বা জীবনের কঠিন থেকে কঠিনতর মুহূর্তের মধ্যে বেঁচে থাকার।
তা যাই হোক, রাতে এসব নিয়েই ভাবছিলাম যখন, ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছিল উত্তেজনায়। আজ সারাদিন বই পড়ে কাটাব, নিজের ঘরে। জানলা দিয়ে দেখে নেব বন্ধু গাছের পাতা, রোদ, লুয়ের বিরুদ্ধে তার নিসস্পৃহ প্রতিবাদ। আমার সকালও কাটবে ওঁদের মত, কিন্ত বিলাস-মনে : দরজায় দাঁড়িয়ে, গ্রিলের ভেতর থেকে রাস্তার লোক দেখে, বিছানায়-বিছানায়, সোফাতে, খবরের কাগজে। বিকেলের পড়ন্ত আলো আমায় জানিয়ে দেবে ওঁদেরই মত, যে দিন চলে যাচ্ছে আরেকটা।

বাজারে বেড়িয়ে মুদিখানার দোকানটা পেরোতেই চোখে পড়ল সেই অভূতপূর্বকে। ক্লাবের মাঠের একধারে কিছু গাছ, তার পাশে একটা ছোট সিমেন্টের দাওয়ার মত বানানো। মাটি থেকে একটু উঁচু। ওপরে ছাদ। তার সামনে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন যাঁরা, তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ষাটোর্ধ্ব। চোখ পড়েনি প্রথমে। তবলার আওয়াজে চমক লাগল। একমনে শুনে যাচ্ছেন। কেউ গাইছেন কি? হবে হয়ত, তাই মনে হল।

আমার চোখের ক্ষমতার বাইরে সে বর্ণহীন মঞ্চ। আমার বোধ জানে না, এও হয়। মাইক নেই, তবুও ওঁরা শুনতে পাচ্ছেন। আমি কিন্তু পাচ্ছি না। অনেকের চোখ বয়সের ভারে ক্লান্ত, তবুও ওঁরা দেখতে পাচ্ছেন। আমি কিন্তু পাচ্ছি না। আমার চোখের সামনে তখন এক আকাশ অপূর্ব রোদ, এক কড়াই মাংসের সাথে গোবিন্দভোগ চালের পোলাওয়ের গন্ধ। সারা সকাল জুড়ে উৎসব বসেছে, বাজার বসেছে। বৈঠকি গানে গানে...