Sunday, 1 May 2016

হরিদ্বারের চিঠি - ১

কী রকম বিকেল জেনেছ তুমি? এখানে বিকেল চিরস্থায়ী। এখানে সন্ধ্যে কীভাবে আসে, তা বুঝতে গেলে তোমায় অনেকটা সময় ঘাটে বসে থাকতে হবে, শতদ্রু। কাজটা তোমার জন্যে সহজ নয় জানি। তোমার শরীর থেকে গত বছরেই বেড়িয়ে গিয়েছিল অনেকটা জীবন। হাসপাতালেও তো কতগুলো দিন একা একা কাটিয়ে ছিলে।
আজ তোমায় মনসা পাহাড়ের গল্প বলি শোন। এক একটা পাহাড় কী ভীষণ রকম একা, ভেবেছ? আর কিছু কিছু পাহাড় ভাগ্যবান। একটা গোটা শহরকে নিয়ে বেঁচে আছে সে। তুমি ভাব শতদ্রু, যদি তোমার পাড়ার পাশেই থাকত একটা আস্ত পাহাড়, ওর কাছে কতবার ফিরে ফিরে যেতে তুমি? ধরে নাও, কলকাতা এত বড় একটা শহর নয়, কয়েকটা ছোট পাড়া মাত্র। ধরে নাও, এর গণ্ডী গড়িয়া থেকে বালিগঞ্জ, ব্যস! তার বেশি নয়। আর এর মধ্যেই যদি ওই ধর ঢাকুরিয়ার কাছে একটা পাহাড় মাথা তুলে আমাদের দেখছে। আমি বা তুমি বা আমরা সবাই কয়েকটা জীবনযাপনের পর, খুব কি যেতাম ওর কাছে? মনে তো হয় না। এদিক থেকে মনসা পাহাড় ভাগ্যবান। হর কী পোড়ী যেতে যে বাজার, তার একটা গলি দিয়ে বেরোলেই মনসা পাহাড়ে পায়ে হেঁটে ওঠার পথ। অনেক সিঁড়ি। তোমাকে বলা হয় নি জানো, সেই ছোটবেলা বাবা আর আমি মিলে উঠেছিলাম একবার পুরোটা পথ পায়ে হেঁটে। একটু একটু করে উঠে যাচ্ছি, আর নীচের শহরের ছোট হয়ে যাওয়াটা দেখে নিচ্ছি প্রত্যেক পদক্ষেপে। আমার মতই এক পাহাড়যাত্রী আমাকে সাবধান করে দিলেন নরম ভাবে – এত পেছনে দেখো না। পা হড়কে যাবে। আমি কী করে বলি শতদ্রু, ওই মুহূর্তে আমি তো পাহাড়ে উঠছিলাম না, আমি আস্তে আস্তে শূন্যে ওঠার যে কী শিহরণ, সবটা শুষে খাচ্ছিলাম সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে। আমার পা বাধ সেধেছিল কিন্তু জানো। কিন্তু তখন সেই হরিদ্বারের বিকেল। মনসা পাহাড়ের চূড়া বেয়ে বিকেল গড়িয়ে পড়ছে আমার গায়ে, মাথায়, বুকে। কিছু সবান্ধব বাঁদরেরা উপভোগ করছে দিনের শেষ আলোয় গাছের পাতার রঙ। কেউ কেউ ওদের মধ্যেই দৈবাৎ পড়ে যাচ্ছে খাবারের লোভে, ছিনিয়ে নিচ্ছে হাত থেকে মনসাদেবীর পুজোর প্রসাদ। ভুল করে মুক্তোর মালা নয়, ওদের হাতে গেঁথে গিয়েছে ফুলমালা। না শতদ্রু। বাঁদর নিয়ে কোন রোম্যান্টিকতা আমার আসে না ঠিকই, কিন্তু বাঁদরেরও কি ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে না কোনদিন?
এভাবেই উঠে গিয়ে তুমি মন্দির না দেখেও নেমে আসতে পার। তাতে অপরাধ নেই। নীচে একটা স্ববিরোধে মোড়া শহর গা এলিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তুমি দেখতেই পারো। স্ববিরোধ কেন? গঙ্গা সন্তান, ধর্মের আখড়ায় ব্যস্ততা কীসের বাপু?
মনসা পাহাড় একা নয়। তুমি যখনই যাবে, দেখবে কত লোক রজ্জুপথ বেয়ে ওঠার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। একা মানুষ একা নয়। চুপ মানুষ একা নয়। হয়তো মনসা পাহাড় নিজেও জানে না, কত মানুষ ওর বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পরম শ্রদ্ধায়। আমিও ‘নতজানু হয়ে ছিলাম তখন, এখনও যেমন আছি’। ওকে আমি এ কথা কীভাবে বলি বলো? আমাকেও কেউ বলেছে কি? আমি শুনেছি? তুমি শুনতে পেয়েছ আমি এতবার বলে গেছি তোমাকে?
তাহলে এস। একবার দাঁড়াই। মুখোমুখি। পাহাড়ের তলায়। আর একবার দাঁড়াই মুখ ফিরিয়ে। পাহাড়ের শীর্ষে। বলি, প্রণাম!

No comments:

Post a Comment